অনলাইন ডেস্ক: শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক, নিয়োগের বৈধতা এবং বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ—সব মিলিয়ে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম কিবরিয়াকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করেই তিনি সিইও পদে নিয়োগের অনুমোদন পেয়েছেন। পাশাপাশি কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার, ভ্রমণ ব্যয়, মেডিকেল বিল ও বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা-২০১২-এর ৩(ক) অনুযায়ী, সিইও পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত রয়েছে।
অভিযোগের সূত্র অনুযায়ী, গোলাম কিবরিয়া ২০১৪ সালে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে সিইও পদে নিয়োগ পান এবং একই বছরের ২৮ আগস্ট আইডিআরএ তাঁর নিয়োগ অনুমোদন করে।
নিয়োগ অনুমোদনের সময় দাখিল করা জীবনবৃত্তান্তে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে বিএ, ১৯৯২ সালে প্রিলিমিনারি এবং ১৯৯৬ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের তথ্য দেন। পাশাপাশি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রির একটি সনদও দাখিল করা হয়।
তবে ওই এমবিএ সনদের সাল নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে কোথাও ২০১০, আবার সনদের তথ্যে ২০১১ সাল উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
নিয়োগ অনুমোদন নিয়েও আইনি প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না হলে বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী পদে নিয়োগ অনুমোদনের সুযোগ আইডিআরএ’র নেই। এরপরও কীভাবে তাঁর নিয়োগ অনুমোদিত হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের দাবি, নিয়োগের সময় দাখিল করা শিক্ষাগত সনদ ও তথ্য যাচাই করা হয়েছিল কি না, করা হয়ে থাকলে কীভাবে তা অনুমোদিত হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। কোম্পানিটির নিরীক্ষা বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার মো. জহিরুল ইসলাম বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও সিইওর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে আইন লঙ্ঘন, অনিয়ম, জালিয়াতি ও কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
ভুয়া কমিশন ও ইনসেনটিভ বিলের অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, উন্নয়ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে বণ্টন না করা কমিশন, ইনসেনটিভ ও বেতন-ভাতার অর্থ বিভিন্নভাবে উত্তোলন করা হয়েছে। এভাবে বছরের পর বছর কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় ৯৯ হাজার ৩৭৯ টাকা আত্মসাতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে আরও বড় অঙ্কের অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
ভ্রমণ ও আপ্যায়ন বিল নিয়েও অভিযোগ
গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি বা কোম্পানির অর্থে ভ্রমণ ব্যয়ের নামে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৩৫ হাজার ৯৯২ টাকা আত্মসাতের দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে আপ্যায়ন ব্যয়ের অর্থ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
উন্নয়ন সভা, বিভিন্ন দিবস ও প্রচারণার নামে বিল উত্তোলনের মাধ্যমেও কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
কোম্পানির গাড়ি ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির একটি গাড়ি অন্য এক কর্মকর্তার নামে বরাদ্দ দেখিয়ে সেটি সিইওর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে জ্বালানি, গ্যারেজ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের নামে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
ভুয়া মেডিকেল বিল ও আইওইউ’র অভিযোগ
গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ভুয়া মেডিকেল বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট অঙ্কের ভুয়া মেডিকেল বিল তৈরি করে তা কোম্পানিতে দাখিল করা হতো।
এ ছাড়া ক্যাশ থেকে আইওইউ বাবদ নগদ অর্থ গ্রহণ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সেই অর্থ সমন্বয়ের অভিযোগও করা হয়েছে।
ভবিষ্য তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, চুক্তিভিত্তিক সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও গোলাম কিবরিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোম্পানির ভবিষ্য তহবিল থেকে প্রায় ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন।
এটি নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
ভুয়া ব্যবসা দেখিয়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ
রূপালী লাইফের বিভিন্ন প্রকল্পে একাধিক ডামি কোড ব্যবহার করে ভুয়া ব্যবসা দেখানো এবং তার বিপরীতে কমিশন, রিনিউয়াল বিল, ইনসেনটিভ, মোবাইল ও জ্বালানি বিলসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কাগজে-কলমে ব্যবসা দেখিয়ে কোম্পানির অর্থ উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসার অস্তিত্ব ছিল না। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করা হয়েছে।
তামাদি পলিসির অর্থ নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে তামাদি পলিসির অর্থ গ্রাহকদের পরিশোধ না করে বিভিন্ন ব্যয়ের ভাউচার দেখিয়ে কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
একই সঙ্গে মৃত্যু দাবি, মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসি ও প্রত্যাশিত সুবিধার অর্থ পরিশোধে গ্রাহকদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর অনেক গ্রাহক তাদের প্রাপ্য অর্থ পেতে সমস্যায় পড়ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরও ব্যবস্থা নেই?
গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আইডিআরএকে নির্দেশ দিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে ওই নির্দেশের পর আইডিআরএ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, এত গুরুতর অভিযোগের পরও সিইও হিসেবে গোলাম কিবরিয়া কীভাবে দায়িত্বে বহাল রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞের নজরদারির পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা শেখ বলেন, বিমা কোম্পানিতে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে বিমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমতে পারে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গোলাম কিবরিয়া ও আইডিআরএ’র বক্তব্য
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও মো. গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
তাই গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা শিক্ষাসনদ, নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ওপরই এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য করুন