
অনলাইন ডেস্ক: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকা মহানগরের পরিকল্পিত নগরায়ণ, ভবনের নকশা অনুমোদন ও নির্মাণকাজ তদারকির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। তবে সংস্থাটির জোন-৪-এর পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়াকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও কথিত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, তার দায়িত্বাধীন এলাকায় ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণকাজ তদারকি এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনৈতিক অর্থ লেনদেনের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নকশা অনুমোদন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
সালেহ আহমেদ জাকারিয়া বর্তমানে রাজউকের মহাখালী জোনাল অফিসে জোন-৪-এর পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মিরপুর, গুলশান, বনানী ও উত্তরার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাও এ জোনের আওতাভুক্ত।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিচালকের অনুমোদন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ফাইল অগ্রসর হয় না এবং ‘ম্যানেজমেন্ট ফি’ নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইমারত পরিদর্শকদের নিয়ে কথিত সিন্ডিকেট
জাকারিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম বিষয় রাজউকের ইমারত পরিদর্শকদের একটি অংশকে ঘিরে কথিত সিন্ডিকেট। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নতুন ভবন নির্মাণের সময় বিভিন্ন ত্রুটি চিহ্নিত করে ভবন মালিকদের জোনাল অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কথিত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা নকশাবহির্ভূত অংশ অপসারণের ভয় দেখানো হয়। পরিদর্শকদের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ পরিচালকের কাছে পৌঁছানোর অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদকর্মীর ওপর হামলার ঘটনায় প্রশ্ন
২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি রাজউকের এক ইমারত পরিদর্শক মো. সোলাইমান হোসেনের বিরুদ্ধে নিজ কক্ষে এক সংবাদকর্মীর ওপর হাতুড়ি দিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই কর্মকর্তা পরিচালকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শী থাকার পরও বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে হামলার ঘটনায় রাজউকের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ
প্রশাসনিক পদায়ন নিয়েও জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনীয় কারিগরি যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও এসএসসি পাস আব্দুর রহিমকে জোন-৩-এর প্রধান ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, ভবন নির্মাণ ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগ্যতা ও কারিগরি দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে রাজউকের সার্ভিস রুলস অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভবন মালিকদের হয়রানির অভিযোগ
জোন-৪-এর আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ভবন মালিকদের নোটিশ দিয়ে হয়রানি এবং পরে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনের সামান্য বিচ্যুতির ক্ষেত্রেও কখনো কখনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পরে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেইলি রোড ও বনানীর অগ্নিকাণ্ডের পর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও রেস্টুরেন্টে রাজউকের তদারকি বাড়লেও এ সুযোগে কোনো ধরনের অনৈতিক অর্থ লেনদেন হয়েছে কিনা, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পূর্বাচলে তার প্রায় ২০ কাঠা জমি, মালিবাগে দুটি ফ্ল্যাট এবং টাঙ্গাইলে বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, বর্তমান বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সম্পদের তথ্য ও আয়ের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কিনা, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
দুদকে অভিযোগের দাবি
জাকারিয়ার বিরুদ্ধে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিষয়গুলো ম্যানেজ করার জন্য অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা বলছেন, রাজধানীর পরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভবন নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, জোন-৩ ও জোন-৪-এ সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার দায়িত্ব পালনকালে অনুমোদিত ভবনের নকশা, নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগ, পরিদর্শন কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো উচ্চপর্যায়ের অডিটের আওতায় আনা যেতে পারে। এতে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে রাজউকের অনুমোদন ও তদারকি কার্যক্রম আরও ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক: মোঃ হাসান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: ফারহান, নির্বাহী সম্পাদক: মুরাদ হোসেন, বার্তা সম্পাদক: রাসেল গাজী, মোবাইল: 01911110129, 01902279843
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয: ২১, নাছিম চেম্বার, ৩য় তলা, দিলকুশা, মতিঝিল, ঢাকা।
© ২০২৫ জনমুক্তি বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত