
অনলাইন ডেস্ক: দেশের ওষুধ শিল্পকে কাঁচামাল উৎপাদনে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে প্রায় দুই দশক আগে গড়ে তোলা হয়েছিল মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) শিল্পপার্ক। কিন্তু প্রকল্পের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো গ্যাস সংযোগ থাকলেও আজও সেখানে সরবরাহ শুরু হয়নি। ফলে চড়া দামের ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ওষুধ শিল্পের জন্য বিদ্যমান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুবিধা কমে যাবে। সে বাস্তবতায় দেশীয়ভাবে এপিআই উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু মৌলিক জ্বালানি সংকটের কারণে বহু বিনিয়োগকারী এখনো উৎপাদনে যেতে পারছেন না।
রাজধানী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর তীরে বিসিকের উদ্যোগে ২০০ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হয়েছে এপিআই শিল্পপার্ক। প্রতিটি শিল্প ইউনিট পর্যন্ত গ্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করা হলেও কোথাও গ্যাস সরবরাহ নেই। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও তা ভারী শিল্প পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
ফলে অধিকাংশ প্লট এখনো ফাঁকা পড়ে রয়েছে। নির্মিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ব্যবহার না হওয়ায় প্রায় ৮০ কোটি টাকার অবকাঠামোও অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে অ্যাকমি ল্যাবরেটরিজ ও হেলথকেয়ার কেমিক্যালস সীমিত পরিসরে এপিআই উৎপাদন করছে। তবে গ্যাসের অভাবে তাদের ডিজেলনির্ভর বয়লার চালাতে হচ্ছে।
হেলথকেয়ার কেমিক্যালস জানিয়েছে, প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্যাস পাওয়া গেলে বর্তমান উৎপাদন ব্যয়ের অন্তত ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব হতো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এপিআই উৎপাদনে রাসায়নিক সংশ্লেষণ, পরিশোধন ও বাষ্পনির্ভর বিভিন্ন ধাপে প্রাকৃতিক গ্যাস অপরিহার্য। ডিজেল ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় চার থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তোলে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত প্রায় ৮৫ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে প্রয়োজনীয় প্রায় ২০০ ধরনের এপিআইর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি উৎপাদিত হচ্ছে।
এলডিসি উত্তরণের পর ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির আওতায় পেটেন্ট সুবিধা সীমিত হয়ে যাবে। ফলে নতুন ওষুধ উৎপাদনে রয়্যালটি ও লাইসেন্স ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে দেশীয় ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি প্রতিযোগিতাও দুর্বল হতে পারে।
শিল্পপার্কে মোট ৪২টি উৎপাদন প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেলেও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখনো অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস ও হাডসন ফার্মাসিউটিক্যালস প্রকল্প থেকে নিজেদের বিনিয়োগ গুটিয়ে নিয়েছে।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস, অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না।
এপিআই উৎপাদনে পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)। কিন্তু পর্যাপ্ত কারখানা চালু না হওয়ায় এটি একদিনের জন্যও ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ব্যয়বহুল এই অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিল্পপার্কের সব অবকাঠামো প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। তবে দেশের গ্যাস সংকটের কারণে এখনই সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, বিকল্প হিসেবে এলএনজি সরবরাহ কিংবা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে এসব পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এলডিসি উত্তরণের আগেই দেশীয় এপিআই উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে ওষুধ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানিও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
তাদের মতে, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে এপিআই শিল্প দেশের ওষুধ খাতের জন্য শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সূত্র: কালবেলা
সম্পাদক: মোঃ হাসান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: ফারহান, নির্বাহী সম্পাদক: মুরাদ হোসেন, বার্তা সম্পাদক: রাসেল গাজী, মোবাইল: 01911110129, 01902279843
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয: ২১, নাছিম চেম্বার, ৩য় তলা, দিলকুশা, মতিঝিল, ঢাকা।
© ২০২৫ জনমুক্তি বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত