অনলাইন ডেস্ক: হতদরিদ্র, এতিম ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত একটি সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্বল পরিকল্পনা এবং তদারকির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্পে প্রায় পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিলেও সংশ্লিষ্ট পেশায় কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ১৯৩ জনের।
সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল রুরাল এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (জিআরইএস) যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। তবে কাগজে-কলমে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখানো হলেও বাস্তবে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়নি বলে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ শেষে মেলেনি লাইসেন্স, বাড়েনি কর্মসংস্থান
লালমনিরহাটের দিনমজুর মজিদ মিয়ার ছেলে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে ২১ দিনের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হলেও তিনি পাননি ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের স্বীকৃত কোনো সনদ। ফলে আগের মতোই বেকার থেকে যেতে হয়েছে তাকে।
আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং প্রকল্পের বড় অংশের বাস্তব চিত্র। প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তার অভাব, অল্প মেয়াদের কোর্স এবং দুর্বল পরিকল্পনার কারণে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি।
নিরীক্ষায় ১৯৬টি গুরুতর আর্থিক আপত্তি
প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নিরীক্ষায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯৬টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি বিধিমালা অনুসারে জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। আবেদন, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা যাচাই ছাড়াই প্রশিক্ষকদের সম্মানী বাবদ ৮ কোটি ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, যা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মিত ব্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ ভাতা ও খাবার ব্যয়েও অনিয়ম
ডিপিপি অনুযায়ী ড্রাইভিং প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক ১০০ টাকা সম্মানী ও ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নির্ধারিত অঙ্কের চেয়ে বেশি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সরকারের প্রায় ৮০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া খাবার ব্যয়ের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত ৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা বিল পরিশোধ এবং উৎসে আয়কর যথাযথভাবে কর্তন না করায় সরকারের ২১ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বেশি রাজস্ব ক্ষতির তথ্যও উঠে এসেছে।
প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত, সুযোগ পেয়েছেন পরিচিতজন
আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্বাচনে ছিল বড় ধরনের অনিয়ম। চার জেলার ২৫ উপজেলার হতদরিদ্র, এতিম ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, প্রকৃত দরিদ্রদের অনেকেই প্রকল্পের বিষয়ে জানতেই পারেননি।
বরং এনজিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচিতজন, আত্মীয়-স্বজন এবং তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হয়েছে।
২১ দিনের প্রশিক্ষণে দক্ষতা অর্জন সম্ভব হয়নি
বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন দক্ষ চালক বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উপযুক্ত কর্মী তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। অথচ এই প্রকল্পে ড্রাইভিং ও কম্পিউটার—উভয় প্রশিক্ষণের মেয়াদ ছিল মাত্র ২১ দিন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক অনুশীলনের সুযোগ ছিল না। একইভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল। প্রশিক্ষণ শেষে সরকারি স্বীকৃত সনদ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স নিশ্চিত না করায় অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারেননি।
প্রায় পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে চাকরি মাত্র ১৯৩ জনের
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চার জেলায় ২ হাজার ৬৪০ জন কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলেও বর্তমানে ওই খাতে কাজ করছেন মাত্র ১২১ জন।
অন্যদিকে ২ হাজার ৫৪৫ জন ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিলেও পেশাদার চালক হিসেবে কাজ করছেন মাত্র ৭২ জন।
সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার ১৮৫ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ১৯৩ জনের, যা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি সম্পদ এনজিওর নিয়ন্ত্রণে
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্প শেষে সরকারি অর্থে কেনা কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরকারের কাছে হস্তান্তর না করে বাস্তবায়নকারী এনজিও জিআরইএস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এতে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
আইএমইডি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
প্রকৃত হতদরিদ্রদের স্বচ্ছভাবে নির্বাচন।
প্রশিক্ষণের মেয়াদ বাস্তবসম্মতভাবে বৃদ্ধি।
প্রশিক্ষণ শেষে সরকারি স্বীকৃত সনদ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিশ্চিত করা।
ডিপিপিতে কার্যকর এক্সিট পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা।
নিয়মিত তদারকি ও মনিটরিং জোরদার করা।
এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী এনজিও গ্লোবাল রুরাল এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (জিআরইএস) এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের আগে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত না হলে এমন প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
তথ্য সূত্র: কালের কন্ঠ
মন্তব্য করুন