একটি জাতির জন্মস্বাধীনতার ঘোষক ও ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণপাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন—“উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” অনেকের মতে, সেই ঘোষণার মধ্য দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে প্রথম অঙ্কুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ। একই সঙ্গে সেদিনই বপন হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভাঙনের বীজও।ঢাকার সেই ময়দানেই জিন্নাহ নগ্নভাবে পদদলিত করেছিলেন বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার। ইতিহাসের পরিহাস—এই ঢাকাতেই একদিন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার স্বপ্নের পাকিস্তান। প্রতিরোধ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঢাকাই হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রতীক, মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গৌরবময় শহর।১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে ঢাকার মানুষ। অসংখ্য নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও তারা মাথা নত করেনি। শেষ পর্যন্ত এই ঢাকাতেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের কিছুদিন পরই ঢাকার পবিত্র মাটিতে ফিরে এসে বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান।তিনি পরে স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন—একজন সাংবাদিক তাকে অনুরোধ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতি লিখে রাখতে। সৈনিক হিসেবে লেখালেখি তার পেশা না হলেও, সেই আবেগঘন মুহূর্ত তাকে কলম ধরতে বাধ্য করেছিল।শৈশব ও পাকিস্তান সম্পর্কে উপলব্ধিভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর তিনি করাচিতে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করে যোগ দেন পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে। তবে ছাত্রজীবন থেকেই পাকিস্তানি সমাজের এক ধরনের বৈষম্যমূলক মনোভাব তার চোখে পড়ে।স্কুলজীবনে প্রায়ই তিনি শুনতেন—কীভাবে বাঙালিদের অবমূল্যায়ন করা হয় এবং তাদের সম্পর্কে ঘৃণা ছড়ানো হয়। পাকিস্তানের অনেক তরুণকেই শেখানো হতো বাঙালিদের ‘নিকৃষ্ট’ মনে করতে। এসব অভিজ্ঞতা তার মনে গভীর ক্ষোভ ও প্রতিবাদের বীজ বপন করেছিল।ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির জাগরণ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি করাচিতে ছিলেন। তখন পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও সরকারি মহল একযোগে বাংলা ভাষার দাবি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে কঠোরভাবে নিন্দা করে। তাদের মতে, এটি ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।এসব দেখে তার মনে দৃঢ় ধারণা জন্মায়—পাকিস্তানিরা বাঙালিদের অধিকার দিতে চায় না, বরং তাদের চিরকাল শোষণের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে চায়।১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও বাঙালির আত্মবিশ্বাস১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয় বাঙালিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে। পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে থাকা বাঙালি ক্যাডেটরাও আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। তারা এটিকে বাঙালির অধিকার ও আত্মমর্যাদার বিজয় হিসেবে দেখেছিলেন।এই সময় এক ঘটনায় পাকিস্তানি ক্যাডেটদের সঙ্গে তাদের তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। বাঙালি নেতাদের অপমান করার প্রতিবাদে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা এক পর্যায়ে মুষ্টিযুদ্ধে গড়ায়। অল্প সময়ের সেই লড়াইয়ে বাঙালি ক্যাডেটের জয় পাকিস্তানিদের অহংকারে বড় ধাক্কা দেয়।পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বৈষম্যপাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের প্রতি ছিল সুস্পষ্ট বৈষম্য। দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের দেওয়া হতো না গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বা স্বীকৃতি। বরং প্রায়ই তাদের ‘অযোগ্য’ বা ‘ভীরু’ বলে অবজ্ঞা করা হতো।এমনকি প্রশিক্ষণ ক্লাসে আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল হিসেবে উপস্থাপন করা হতো এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের শত্রু বলে শেখানো হতো।আইয়ুব শাসন ও বাঙালির প্রতিরোধআইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় বাঙালিদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দমননীতি আরও জোরদার হয়। তবে সেই সময় থেকেই ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্য স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে এবং ভবিষ্যৎ মুক্তিযুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে।১৯৬৫ সালের যুদ্ধ ও বাঙালি সৈনিকদের বীরত্ব১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি একটি ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে অংশ নেন। খেমকারান রণাঙ্গনে তার নেতৃত্বাধীন “আলফা কোম্পানি” বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে এবং প্রশংসা অর্জন করে।এই যুদ্ধে বাঙালি সৈনিকদের দক্ষতা পাকিস্তানিদের সেই ধারণা ভেঙে দেয়—যে বাঙালিরা নাকি ভালো সৈনিক নয়। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি ইউনিটের চেয়ে বাঙালি সৈনিকরাই অধিক সাহসিকতা দেখিয়েছে।ইতিহাসের শিক্ষাপাকিস্তানি শাসকদের অবজ্ঞা, বৈষম্য ও শোষণ বাঙালির মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমশ তীব্র করে তোলে। ভাষা আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সামরিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে স্বাধীনতার চেতনা—যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে।সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ—একটি জাতির দীর্ঘ লড়াইয়ের বিজয়গাথা।
মন্তব্য করুন